
আধুনিক জীবনের চাপ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং অনিয়মিত দৈনন্দিন রুটিনের ফলে অনেকেই নানা ধরনের অপ্রিয় শারীরিক সমস্যা নিয়ে ভুগছেন। অ্যানাল ফিশার, অর্থাৎ মলদ্বারে ফাটা এরকম একটি সমস্যা যা মানুষ সাধারণত লজ্জার কারণে লুকিয়ে রাখেন এবং যথাযথ চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে সমস্যাটি বড় আকার ধারণ করে। গবেষনায় দেখা গেছে, প্রতি ৩৫০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন এই রোগে ভোগেন। পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে এটি সমানভাবে দেখা যায় এবং প্রায়শই ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী বয়স্কদের মধ্যে দেখা যায় [সূত্র]।
অ্যানাল ফিশার কী?
অ্যানাল ফিশার হলো মলদ্বারের ভেতরের ত্বকে ফাটল বা কাটা। এটি একটি ক্ষত যা মলত্যাগের সময় প্রচণ্ড ব্যথা সৃষ্টি করে। ফিশার সাধারণত মলদ্বার ছিড়ে ছোট আঘাত থেকে উৎপন্ন হয়। এটি অল্পদিনের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যেতে পারে, তবে অনেক সময় চলতে চলতে দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করতে পারে যাকে ক্রনিক এনাল ফিশার বলা হয়ে থাকে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?
- যারা দীর্ঘদিন ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় ভুগছেন
- গর্ভাবস্থায় নারীরা
- হেমোরয়েড বা মলদ্বারের অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা
- দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকেন এমন ব্যক্তিরা।
অ্যানাল ফিশারের সাধারণ লক্ষণসমূহ
- মলত্যাগের সময় জ্বালা বা ব্যাথা অনুভব করা
- মলদ্বারে ছোট ফাটল দেখা যাওয়া
- মলদ্বার থেকে রক্তপাত
- মলত্যাগের পরে কিছু সময় পর্যন্ত ব্যথা অনুভূত হওয়া
- মলদ্বারের পেশী সংকোচনের কারণে মলত্যাগে অসুবিধা হওয়া
অ্যানাল ফিশারের কারণ
- দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া থাকা
- খুব শক্ত বা বড় মলত্যাগ
- টয়লেটে অনেকক্ষণ বসা
- প্রসব বা মলদ্বারের আঘাত
- অ্যানাল সেক্স অথবা মলদ্বারে যান্ত্রিক আঘাত
- তীব্র মলদ্বারের সংক্রমণ
অ্যানাল ফিশার প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা
প্রতিরোধ:
- খাদ্যতালিকায় ফাইবার সমৃদ্ধ বা আশজাতীয় খাবার, যেমন সবুজ শাকসবজি, ফল, বাদাম এবং স্বাস্থ্যকর দানা সংযোজন করা।
- পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা, দৈনিক কমপক্ষে ৮ গ্লাস জল পান করার চেষ্টা করা।
- নিয়মিত ব্যায়াম ও হাঁটা, যা হজমের পদ্ধতিকে সাহায্য করবে।
- টয়লেটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা থেকে বিরত থাকা।
- কোষ্ঠকাঠিন্যের কোনো লক্ষণ থাকলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া।
চিকিৎসা:
১. হালকা ক্ষেত্রে:
ফাইবার সাপ্লিমেন্ট এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার মাধ্যমে মল নরম রাখা হয়। ব্যথা কমানোর জন্য Sitz bath (কুসুম গরম পানির সিটিং) করা যায়, যা পেশী শিথিল করতে সাহায্য করে।
২. ঔষধ ব্যবহার:
ডাক্তার প্রদত্ত অ্যানালজেসিক ক্রিম বা জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। তদুপরি, গ্লিসারিন এবং ময়েশ্চারাইজারও উপকারী।
৩. যদি ফিশার দীর্ঘস্থায়ী হয়:
অ্যানাল স্পিংক্টার টোনিসিটি বা উচ্চ চাপ থাকলে ডাক্তারকে দেখাতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে সার্জারি (ওপেন বা লেজার LIS) করা প্রয়োজন হতে পারে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?
- যদি ব্যথা খুব তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়।
- মলদ্বার থেকে বেশি রক্তপাত হয়।
- ফিশার ৮ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে না ভালো হয়।
- কোনো ধরণের দুর্গন্ধ বা পুঁজ জমে থাকে মলদ্বারে।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে কী হবে?
- মলদ্বারে ফোড়া হতে পারে।
- মলদ্বারে ফিস্টুলা বা নালী হতে পারে।
পরিশেষে
অ্যানাল ফিশার একদমই লজ্জার নয় এবং এটি খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। তবে সঠিক পরামর্শের অভাবে সময়ের সাথে সাথে এটি জীবনযাত্রার মান ব্যাপকভাবে ব্যাহত করে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনধারার মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার মাধ্যমে দ্রুত সারানো সম্ভব। তাই সমস্যাটি অনুভব করলেই অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।
স্বাস্থ্যই জীবনের প্রকৃত সম্পদ, তাই নিজেকে সুস্থ রাখুন এবং শরীরের যে কোন ধরনের অস্বস্তি ও সমস্যা লুকিয়ে রাখার আগে জানুন ও সমাধান করুন।
সাধারন জিজ্ঞাসাঃ
১। অ্যানাল ফিশার থেকে কি ক্যান্সার হতে পারে?
- না। অ্যানাল ফিশার কখনো ক্যান্সারে রূপ নেয় না। তবে শুরু থেকেই অ্যানাল ফিশারের সাথে ক্যান্সার থাকতে পারে, যা সম্পূর্ন ভিন্ন দুইটি রোগ।
২। অ্যানাল ফিশার হলেই কি অপারেশন লাগে?
- না। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপারেশন লাগে না। ডাক্তারের পরামর্শ নিলে অসুখের তীব্রতা অনুযায়ী কিছু ওষুধ দিবেন এবং জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের জন্য উপদেশ দিবেন।
৩। অ্যানাল ফিশার অপারেশনের সফলতা কেমন? একবার অপারেশন করলে কি আবার হয়?
- অ্যানাল ফিশার অপারেশনের সফলতা বেশ ভাল। এটি ওপেন এবং লেজার দুইভাবেই করা যায়। দুইক্ষেত্রেই সফলতার হার ৯০%।
আপনার যদি আরো কোন প্রশ্ন থাকে, আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত আছি!
পরামর্শের জন্য আজই সিরিয়ালের জন্য যোগাযোগ করুন।
ডা. মঈন উদ্দিন মাহমুদ
কোলোরেক্টাল ও এন্ডো-ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন
পড়ে খুব ভালো লাগলো।
অনেক ধন্যবাদ
পড়ে খুব ভাল লাগল।অনেক অনেক ধন্যবাদ
অনেক ধন্যবাদ